অযত্ন-অবহেলায় কুতুবদিয়া বাতিঘর

কক্সবাজারের সাগরঘেরা দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার ঐতিহাসিক বাতিঘর বঙ্গোপসাগর পথে দেশি-বিদেশি নাবিকদের পথের সন্ধান দিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। প্রায় দুই শতাব্দীরও পুরনো এ বাতিঘরটির প্রতি কারও তেমন নজর আছে বলে মনে হয় না। অযত্ন-অবহেলায় আলো জ্বলুক না জ্বলুক কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বাতিঘরটি। সরেজমিন দেখা গেছে, কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ধুরুং আলী ফকির ডেইলের গ্রামের পশ্চিম সমুদ্রসৈকতে বাতিঘরটির অবস্থান।জানা যায়, ব্রিটিশ সরকার ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে ৪ হাজার ৪২৮ টাকা ব্যয়ে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে এটি নির্মাণ করেছিল, যা ছিল আট তলাবিশিষ্ট এবং গোলাকৃতির। উচ্চতা ১২০ ফুট। মাটির নিচেও একতলা ছিল। প্রতি তলার উচ্চতা ১৫ ফুট। এ বাতিঘরের আলো চতুর্দিকে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়াত। স্বাধীনতার আগে ঐতিহাসিক এ বাতিঘরটি ভেঙে পড়েছিল। এর এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বেড়িবাঁধের ভেতর ১৯৭২ সালে স্টিল অ্যাঙ্গেল দ্বারা এটি ফের স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এটিই সাগরপথে চলাচলকারী অসংখ্য মাঝি-মাল্লা ও দেশি-বিদেশি জাহাজের নাবিকদের পথ দেখায়। কুতুবদিয়া বাতিঘরের ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গভীর সমুদ্রে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র। ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাস্তবায়নাধীন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের অবস্থান। তাছাড়া বর্তমানে কুতুবদিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকার ২০১০ সালে এ গ্যাসক্ষেত্রের সফল জরিপ কার্যক্রম চালিয়েছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কুতুবদিয়ার ঐতিহাসিক বাতিঘরটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম_ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাতিঘরটির রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করছে অভ্যন্তরীণ নৌ-বাণিজ্য অধিদফতর। প্রাচীন বাতিঘরটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এখনও। যে অবস্থায় পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল সে অবস্থায় রয়ে গেছে। প্রায় সাত একর জায়গার ওপর স্থাপিত বাতিঘরের মধ্যে একটি রেস্ট হাউস ও দুটি আবাসিক কোয়ার্টার ২০ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। একমাত্র ওয়্যারলেস যন্ত্রটি ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নষ্ট হয়ে যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, বাতিঘরে বিভিন্ন আগাছা-পরগাছায় জরাজীর্ণ ভবন যেন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। বিশাল এলাকায় বাউন্ডারি ওয়ালে ঘেরা একটি বিশাল দীঘি ও চার-পাঁচ একর জায়গা রয়েছে। এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এখানে কর্মরত ইনচার্জ প্রতি মৌসুমে বিভিন্ন ক্ষেতখামার করে তা ভোগ করেন। অথচ এ জায়গাগুলো লিজ দিলে প্রতি বছর অন্তত চার-পাঁচ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হতে পারে। বাতিঘরে জেনারেটরের মাধ্যমে ১৫টি ব্যাটারিতে চার্জ করা হয়। ওই ব্যাটারির মাধ্যমে বাতিঘরে আলো জ্বলে থাকে। জেনারেটরের জন্য বার্ষিক ৩ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ থাকে। প্রায় সময় ইঞ্জিন বিকল দেখিয়ে ডিজেল বাইরে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাতিঘরের আলো জ্বালানো কর্মরত কর্মচারীদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে। এতে সমুদ্রপথে বিভিন্ন বোট-জাহাজ অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। বাতিঘর এলাকায় বেড়িবাঁধের অবস্থা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। শিগগিরই এখানে বেড়িবাঁধের ব্যবস্থা করা না হলে বাতিঘরটি ও সমুদ্রে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাতিঘরে যাওয়া-আসার একমাত্র রাস্তা আকবর শাহ রোডের অবস্থাও বেহাল। প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কটির ব্রিক সলিং হয়েছিল বহু আগে। এক কিলোমিটার এলাকা এখনও কাঁচা রয়ে গেছে। এ সড়কের বেশিরভাগ ইট চুরি হয়ে গেছে এবং বাকিগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দেশি-বিদেশি যে কেউ কুতুবদিয়ায় এলে তারা অবশ্যই বাতিঘর দেখতে যান এ সড়ক হয়ে।কুতুবদিয়া দ্বীপ বাঁচাও আন্দোলনের মহাসচিব আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, কুতুবদিয়া আসলেই অবহেলিত একটি দ্বীপ। অবিলম্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি কুতুবদিয়া বাতিঘরটি সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছি। এসব বিষয়ে জানতে কুতুবদিয়া বাতিঘরের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এখানে ২২ বছর ধরে একাধারে চাকরিকালীন একদিনও বাতিঘরের আলো বন্ধ থাকেনি। তাছাড়া বাতিঘরে জমি ও দীঘি এ পর্যন্ত তিনি ভোগ করে আসছেন বলে স্বীকার করেন। ডিজেল পাচারের বিষয়টি সত্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি। কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, সরকারের কুতুবদিয়া বাতিঘরটির প্রতি নজরদারি বাড়ানো উচিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Light House Of Kutubdia //কুতুবদিয়া দ্বীপ’ বিখ্যাত বাতিঘরের কারণে..........@

ঘুরে আসুন কুতুবদিয়া বাতিঘর

এক নজরে ৬নং আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন