লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে কুতুবদিয়াবাসী!
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের এক-চতুর্থাংশ গত প্রায় তিন দশকে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। বেশ কয়েক হাজার মানুষ এ জনপদটি থেকে চলে গেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোস্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আজ থেকে ৫০ বছর পরে এ দ্বীপ সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব কথা উল্লেখ করা হয়। ‘বাংলাদেশ আইল্যান্ড লুজিং ব্যাটেল টু স্টেম ক্লাইমেট টাইড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় গতকাল সোমবার।
বাংলাদেশের দক্ষিণের একটি উপজেলা কুতুবদিয়া। এখন এর জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ। দিন দিন সমুদ্রের পানিতে এলাকা নিমজ্জিত হওয়ায় এখান থেকে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ চলে গেছে ৮০ কিলোমিটার দূরের জেলা শহর কক্সবাজারে। শহরে এসে বেশির ভাগ মানুষের ঠাঁই হয়েছে বস্তিতে। সেখানে মাছ ধরে বা নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ হয় তাদের। মাছ শুঁটকি তৈরির কাজে আছেন অনেকেই। কেউ কেউ হয়েছে রাজধানী ঢাকামুখী। প্রতিনিয়ত এ দ্বীপটির মানুষ বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে চলে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিলীন হওয়ার মুখে থাকা দ্বীপটির মানুষের লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ছে দিন দিন।
কুতুবদিয়ার দ্বীপের বাড়ি হারানো এক মানুষ নূর হোসেন বলেন, ‘আমার বাড়ি যেখানে ছিল, এখন সেখানে মানুষ মাছ ধরতে যায়। আমাদের গ্রামে মসজিদ, স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার—সবই ছিল। এর সবকিছু পানিতে হারিয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের।’
এ দ্বীপকে সমুদ্রের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে নানা তৎপরতা আছে। তবে সেসব প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কংক্রিটের তৈরি ব্লক ভেঙে পড়ে আছে ঢেউয়ের তোড়ে। আবার অনেকগুলোর ওপর পড়েছে বালুর আস্তরণ।
দ্বীপের অনেক মানুষ ভুলে গেছেন ঠিক কতবার সমুদ্রের পানিতে প্লাবিত বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে অন্যত্র। দ্বীপবাসী হামিদা বেগমের কথা, ‘কখন আমার ঘরে পানি উঠবে, এই ভয়ে আমি থাকি সব সময়। বর্ষাকালে বাড়িতে থাকার কোনো জো থাকে না। কিন্তু এরপরও আমাদের এখানে থাকতে হয়। অন্যত্র যাওয়ার জন্য আর্থিক অবস্থা আমাদের নেই।’
হামিদা বলেন, ‘পানিতে বাড়িঘর ডুবে গেলে আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। তখন কারও জায়গায় ভাড়া থাকি। এটা সত্যিই কষ্টকর।’
হামিদার তবু এখন থাকার একটি ঘর আছে। তবে ৪৩ বছরের লুৎফুন নাহারের তা-ও নেই। তিন মাস আগের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তাঁর বাড়ি চলে গেছে। এই নারী এখন তাঁর বাবার সঙ্গে থাকেন। তিনি বলছিলেন, ‘বর্ষার সময় বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়। তবে এবার আমার বাড়ি একেবারে চলে গেছে।’
লুৎফুন নাহারের পাঁচ ছেলেমেয়ে। তিনি বলছিলেন, ‘বাবার বাড়িতে চিরকাল থাকতে পারব না। বাড়িটি তেমন বড়ও না। কিন্তু কোথায় যাব তা জানি না।’
এএফপির প্রতিবেদনে জার্মানিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জার্মানওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এ তালিকায় আরও রয়েছে ফিলিপাইন, মিয়ানমার ও হাইতি।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এসব মানুষকে নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কোস্টের মকবুল আহমেদ বলেন, ‘বিপর্যয়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া এসব দ্বীপবাসীর জন্য সরকারের করণীয় রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব এসব মানুষকে রক্ষা করা।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে পরিবেশ ও বনসচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘ উপকূল আছে। প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস করে উপকূলীয় এলাকায়। এসব মানুষকে যদি তাদের এখনকার বসবাসের এলাকা থেকে সরাতে হয়, তবে সেটি বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের জন্য খুবই দুরূহ বিষয়। আসলে আমরা এসব মানুষকে কখনোই অন্যত্র নিতে পারব না।’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন