কুতুবদিয়া রক্ষায় স্থায়ী বেঁড়িবাধের পাশাপাশি বনায়ন জরুরী//=এম.নজরুল ইসলাম, কুতুবদিয়া।
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়,বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে সমূদ্রের লোনা পানি লোকালয়ে ডুকে বসবাসের ঘর-বাড়ি,ক্ষেত-খামারসহ জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশংকায়। গেল বছর স্থানীয় সাংসদের আপ্রাণ সহযোগিতায় উপকূলের বিধ্বস্ত বেঁড়িবাধের প্রায় সবকটি পয়েন্ট জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার করলে দ্বীপের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কিন্তু এ বছর এখনো পর্যন্ত বেঁড়িবাধের স্থায়ী কোন ব্যবস্থা না হওয়া আবারো ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো ভেঙ্গে লোনা পানিতে লোকালয় প্লাবিত হয়ে ক্ষতির আশংকা করছে স্থানীয় জনসাধারণ। তাছাড়া ভূমি প্রশাসনের দাখিলা বাণিজ্যের কবলে পড়ে উপকূলীয় বনবিভাগের বন ও বনভূমি চরমভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলে। ভূমিদস্যু, ভূমি প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভিন্ন নীতির কারণে নতুনভাবে বনায়ন তো দূরের কথা যে টুকু রয়েছে তাও দিন দিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। যদিও স্থানীয় বনবিভাগ দাবী করছে প্রতি বছর বনভূমিতে রোপন করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা । কিন্তু বিভিন্ন উদ্যোগের পরেও চারাগুলো ঠিকাতে পারেনি বনবিভাগ। স্থায়ী বনায়নের কোন পরিকল্পনা নাই বলেই দ্বীপের চতুরদিকে বনায়ন গড়ে তুলা সম্ভব হচ্ছেনা এমনই অভিযোগ বিশেষজ্ঞ মহলের। তাদের অভিযোগ প্রভাবশালীদের সাথে আতাত করে দাখিলা বাণিজ্যের মাধ্যমে বনায়নের প্রায় সব জায়গা ভূমিদস্যুদের দখলে ছেড়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যে কারনে বনায়নতো দূরের কথা বন বিভাগের জায়গাগুলোই বেদখল করে রেখেছে প্রভাবশালীরা। আর মূলত এই কারনেই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। বনবিভাগ ঠিকমত বনায়ান করে দ্বীপের চতুরপার্শ্বে সবুজ ব্যষ্টনি তৈরি করতে পারলে এ দশা হতনা অভিমত সচেতন মহলের।
কুতুবদিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্মারক নং ১৪২ তারিখ ০৩/০১/০৮ মতে বিএস খতিয়ান নং ৩,৪ ও ৬ মূলে বন বিভাগের ৮৬৭ পয়েন্ট ৬৯৭.২৭একর জায়গা রয়েছে। মৌজা ওয়ারী বনভূমি সমুহ হচ্ছে উত্তর ধূরুং এ ৪৪.৫১ একর, লেমশীখালীতে ২২৪.৮৮একর, খুদিয়ারটেকে ১৮৭.৪৭একর, বড়ঘোপে ১০৬.৬১একর ও আলী আকবর ডেইলে ৩০৩.৮০একর।
গেল বছর কক্সবাজার জেলা এডিসি (রাজস্ব) এক চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যে, সমুদ্রের ভাটার স্থান থেকে উপরে ১৫০-২০০ফুট পর্যনন্ত বনায়ন করতে পারবে। অনেকে চিঠিটি দলিল হিসেবে ধরে নিয়ে নতুন পুরাতন জায়গা সমুহ পুনরায় দখল করে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এ দিকে বন বিভাগ উচ্ছেদ অভিযানের নামে একাধিক বার টহল জোরদার করলেও তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমূদ্রের পানির স্থর বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের যে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো তলিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন তার মধ্যে দেশের দক্ষিণাংঞ্চলের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া অন্যতম। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দ্বীপের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশী। বর্গ কিলোমিটারের এ দ্বীপে প্রায় দুই লক্ষাধীক মানুষের বসবাস। বর্তমানে যে অবস্থানে এসে ঠেকেছে তা অতীতের এক পঞ্চমাংশেরও কম। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও জলোচ্ছাসের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে এই দ্বীপের অবস্থা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে বলা যায়। দ্রুত দ্বীপ রক্ষায় কোন স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে খুব অচিরেই সমূদ্রগর্ভে বিলিন হতে পারে এ দ্বীপ। মুছে যাবে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে এক খন্ড ভূখন্ড। দূর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা দ্বীপের মানুষগুলো আতংকের উপর বসবাস করছে। বর্ষা আসলেই জনমনে সৃষ্টি হয় আতংকের চাপ। চতুরদিকে অরক্ষিত বেড়িবাঁধের খোলা মুখের হাতছানি যেন বলছে, আর কত দিন ঠিকে থাকার যুদ্ধ করবে? এবার ক্ষান্থ হউ।
ভূমি প্রশাসন বন বিভাগকে ২০ বছরের মধ্যে বন সৃজনে ব্যর্থতার ধূঁয়া তুলে বন বিভাগের খতিয়ান ভূক্ত শত শত একর বনভূমি একসনা ও দ্বীর্ঘ মেয়াদী লীজ দিয়ে খাজনা আদায় করে যাচ্ছে উপজেলা ভূমি প্রশাসন। এ পরিস্থিতিতে বন বিভাগ চোরকে বলে চুরি কর গৃহস্থকে বলে সজাগ থেকো নীতি নিয়ে এগুচ্ছে বলে ধারনা করছে বিশেষজ্ঞ মহল। এ অবস্থায় বৈশ্বিক জলবায়ূ ঝুঁকি সুচকে চিহ্নিত দ্বীপ উপজেলায় চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক বনায়ন না করলে কুতুবদিয়ার প্রায় দু’লাখ জনবসতির জীবনমান আরও মারত্মক হুমকীর সম্মুখীন হবে। ভূমি দস্যূরা ওই এলাকায় ১৮ হাজার কেওড়া ও বাইন গাছের ছায়া নিধন করেছে। এতে বনাঞ্চল ধ্বংস, পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীব বৈচিত্রের মারাত্মক ক্ষতিসহ বন বিভাগের অর্ধ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করে মামলাও করেছে ইতিমধ্যে। বন কর্তৃপক্ষ বলেন যেই হোক বন নিধন ও বনভূমি দখল করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে বলে জানান। যদিও ১/১১’এ সময় যৌথ বাহিনী বহু ভূমিদস্যুদের উচ্ছেদ করে দেয়। পরবর্তীতে তা আবার ভূমি প্রশাসনের সহযোগিতায় আবারো দখলে নিয়েছে।
ভূমি প্রশাসন বনবিভাগ হতে একদিকে ভূমি উন্নয়ন কর দাবী করছে অপরদিকে ব্যাপক দূর্নীতির মাধ্যমে বনবিভাগের খতিয়ানভূক্ত জায়গাগুলো দীর্ঘমেয়াদী ও একসনা দাখিলা দিয়ে বনভূমি বেহাত করে দিচ্ছে।এভাবে বনভূমি সমুহ বেহাত হয়ে গেলে জলবায়ূ ঝুঁকি মোকাবেলায় কুতুবদিয়ায় বনানয়ন ও সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টি করার জায়গা থাকবেনা। এক বিষেশজ্ঞ সমীক্ষায় জানাগেছে কুতুবদিয়ার পূর্বে ম্যানগ্রোভ বাগান ও পশ্চিমে ঝাউবাগান ও উত্তর-দক্ষিণে অন্যান্য বনজ গাছ সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হবে। এ অবস্থায় কুতুবদিয়ার প্রভাশালী ভূমিদস্যুরা ভূমি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বনভূমি সমুহ অব্যহতভাবে বে-দখল করে নিচ্ছে। কুতুবদিয়ার মাটি ও মানুষ নিয়ে তারা রাজনীতি করে বটে কুতুবদিয়ার অস্থিত্ব রক্ষায় তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। তাই ভূমি দস্যুদের কবল থেকে বন ও বনভূমি উদ্ধার করে ব্যাপক হারে বনায়ন না করা হলে কুতুবদিয়ার পৌনে দু’লাখ জনবসতীর দ্বীপ অচিরেই সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংখা রয়েছে বলে জানান স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা অসিত কুমার শাহা বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে ভূমি প্রশাসন বন বিভাগের অধিকাংশ জায়গা দাখিলা দিয়ে বাৎসরিক খাজনা আদায় করে যাচ্ছে। এ বিষয় নিয়ে ভূমি প্রশাসনের সাথে বন বিভাগের বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন থেকে।ি তনি জানান এই ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহীত করা হয়েছে। এছাড়া বনায়নোপযুগী প্রায় সব জায়গায় বনায়ন আছে এবং বাকী জায়গায়ও বনায়ন করার জন্য শিঘ্রই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহীন তানভীর গাজী বনায়নের ব্যপারে বলেন,ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে কুতুবদিয়ার চারপাশে ম্যানগ্রোভ বনের ব্যষ্টনি সৃষ্টি করার একটি বিশেষ উদ্যোগ বাস্তাবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কুতুবদিয়া ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া কুতুবদিয়া রক্ষার চিন্তাভাবনা নিয়ে দীর্ঘ একবছর ধরে কুতুবদিয়া অবস্থান করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালযের ফরেস্ট্রি বিভাগের একটি গবেষক দল। দাখিলা বাণিজ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, কুতুবদিয়ায় দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে নতুন করে কোন ধরনের দাখিলা বাণিজ্য হয়নি এবং হবেনা। বরং বেদখলকৃত সরকারি খাস জমিগুলো দখলমুক্ত করে সেসব জায়গায় ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছেন বলে জানান তিনি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন