কুতুবদিয়া হচ্ছে মূল ভূখ-ের গাইডওয়াল।
সমুদ্র উপকূলীয় দ্বীপ কুতুবদিয়া মূল ভূখ-ের গাইডওয়াল। কুতুবদিয়া বাঁচলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বাঁচবে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কুতুবদিয়া লবণশিল্প, মৎস্যসম্পদ, চিংড়িঘেরসহ নানাভাবে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও সরকার কুতুবদিয়ার উন্নয়নে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরেও জাতীয় গ্রিডলাইনের সঙ্গে কুতুবদিয়া সংযুক্ত হয়নি। মেরিন ড্রাইভের মাধ্যমে বিদ্যুতের লাইন আনার দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় উন্নয়ন
সুবিধা থেকে কুতুবদিয়াবাসীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের সুষম উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটছে না। বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড়ের পরও আইলার আঘাতে ল-ভ- কুতুবদিয়ার বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকার গড়িমসি করছে। অথচ হাজার হাজার একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের একমাত্র বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে সাগরের জোয়ারের পানি ঢুকে হুমকির সম্মুখীন। কথাগুলো বলেন কুতুবদিয়া-মহেশখালী সংসদীয় আসনের সাংসদ হামিদুর রহমান আজাদ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্ভাবনাময় দ্বীপটি আজ অবহেলিত। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৪ কিলোমিটার প্রস্থ কুতুবদিয়া দ্বীপ সঙ্কুচিত হয়ে বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশের মানচিত্রে গ্রোথিত কুতুবদিয়ার বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থে পূর্ব-পশ্চিমে ২ কিলোমিটার কমে এসেছে। জায়গাজমি বসতবাড়ি সাগরগর্ভে বিলীন হওয়ায় অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে উপকূলীয় ৩০ হাজার মানুষ। আর এ কারণে বদলে গেছে দেশের মানচিত্র। বদলে গেছে উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রা। বিপন্ন হয়ে পড়েছে জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিন গত ২৮ ডিসেম্বর সাগরঘেরা দ্বীপ কুতুবদিয়া ঘুরে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপটির ৩৫ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে প্রাণহানির ঘটনা এখানেই সবচেয়ে বেশি। ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটি ল-ভ- হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশে মৃত্যু উপত্যকায় রূপ নেয়। আকাশে-বাতাসে লাশের গন্ধে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে পুরো কুতুবদিয়া। পরিবেশবাদীদের মতে, দীর্ঘদিন যাবৎ মানুষ নির্বিচারে প্রকৃতির প্রতি অবিচার করে আসছে। নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রকৃতির রূঢ় আচরণে প্রকৃতি একসময় পাল্টা প্রতিশোধ নিয়েছে। এই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে কুতুবদিয়ার রূপবৈচিত্র্য। শান্তিপ্রিয় শান্ত মানুষের সারা জীবনের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। পিতা-মাতা হারিয়েছে সন্তান, সন্তান হারিয়েছে পিতা-মাতা। স্ত্রী হারিয়েছে স্বামী। স্বামী হারিয়েছে স্ত্রী।
প্রতিটি ঘরেই বিষাদসিন্ধু আর টাইটানিকের মতো গল্প নিয়েই জন্মভূমির টানে জীবনের প্রয়োজনে চৌদ্দ পুরুষ চাষার জন্য জীবন কাটছে এখানে। তবুও জীবন তো থেমে থাকে না। কুতুবদিয়ার সংগ্রামী মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। গড়ে তোলে স্বপি্নল এক নিজস্ব ভুবন। ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত দ্বীপটিতে বসতবাড়ি, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সবই গড়ে ওঠে।
সমপ্রতি সিডর, বিজলি, আইলাসহ ঘূর্ণিঝড় বারবার ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। ঘন ঘন নিম্নচাপ ভাবিয়ে তুলছে দ্বীপবাসীকে। এরই মধ্যে আইলার আঘাতে কুতুবদিয়ার বেড়িবাঁধ ভেঙে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, চিংড়িঘের, লবণের মাঠে হু হু করে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল চিংড়িচাষ ও লবণচাষের জন্য উপকূলীয় বনাঞ্চল প্যারাবনের হাজার হাজার একর জমির বাইন, কেওড়া ও ঝাউবাগান উজাড় করে ফেলেছে। পুরো কুতুবদিয়াকে মরুকরণ করে ছেড়েছে। এ কারণে দ্বীপবাসী এখন শঙ্কিত। না জানি কবে কখন আবারো ৯১'র ঘূর্ণিঝড়ের মতো অবস্থা হয়। এ আশঙ্কার কারণ দ্বীপের রক্ষাকবচ প্যারাবন, ঝাউবন উজাড় করায় দ্বীপ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু দ্বীপবাসী প্রভাবশালী মহলের কাছে খুবই অসহায়। খোদ বন বিভাগ নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছে। বন বিভাগের লোকবলের অভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বভাব। স্বভাবচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দ্বীপবাসীর। দ্বীপবাসীর অভিযোগ, রক্ষক হয়েছে ভক্ষক। বন বিভাগের সহযোগিতায় কুতুবদিয়ার সবুজ প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার একর জমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আগে ওইসব ভূমিতে লবণ, চিংড়ি মাছের চাষ হতো। ২০০১ সালের আগে ধানচাষ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে অনেকের বসতবাড়ি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। উত্তর ধুরুং এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান কুতুবদিয়ার আয়তন যতটুকু আগে তার দ্বিগুণ ছিল। ৩৫ কিলোমিটারের দ্বীপটি এখন ১০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। প্রায় সোয়া লাখ মানুষের মধ্যে ২৫% মানুষ নিম্ন শ্রেণীর যারা এখন বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকেই বেড়িবাঁধের ওপর ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর করে কোনোমতে বসবাস করছে।
খুদিয়ারটেক গ্রামের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম জানান, আমাদের গ্রামটির সিংহভাগ এলাকা সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বসতবাড়ি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বড়ঘোপ মিয়াপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছি। বিলীন হওয়া গ্রামটিতে জামেউল উলুম মাদ্রাসার ভবন বিলীন হয়ে যায়। পরে নতুন করে অন্যত্র মাদ্রাসা করা হয়। বর্তমান আলী আকবরের ডেইল, তবলেরচর, বড়ঘোপ, কুমিরেরচর, জেলেপাড়া, উত্তর ধুরুং, কৈয়ারবিল এলাকার বিস্তীর্ণ ভূমি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
কুতুবদিয়ার বাসিন্দা হামিদুর রহমান আজাদ এমপি জানিয়েছেন, কুতুবদিয়া দ্বীপটি তেল-গ্যাসে ভাসছে। এখানে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার লবণশিল্প, চিংড়িঘের, মৎস্যসম্পদ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। এর পরও সরকার এখানকার উন্নয়নে একচোখা নীতি অনুসরণ করছে। অথচ আইলার আঘাতে কুতুবদিয়ার সিংহভাগ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে বিলম্ব হলে আগামী বর্ষায় কুতুবদিয়ার পরিস্থিতি নাজুক হবে। আর কুতুবদিয়ার বিপর্যয়ের খেসারত দেবে পুরো চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কক্সবাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ। কারণ কুতুবদিয়া হচ্ছে মূল ভূখ-ের গাইডওয়াল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন